ওসিই মাহমুদুর রহমানকে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেন : মির্জা ফখরুল
হাইকোটের্র রায় থাকায় মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের ২১তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের যে কোটা তাতে হাইকোটের্র রায় রয়ে গেছে। যেখানে হাইকোটের্র রায়ে আছে যে, মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সংরক্ষিত থাকবে। তাহলে ওই কোটার বিষয়ে তারা কীভাবে কোটের্র ওই রায় ভায়োলেট করবেন। সেটা তো তারা করতে পারছেন না। এই রায় অবমাননা করে তখন তো তিনি কনডেম্প অব কোটের্ পড়ে যাবেন। এটা তো কেউ করতেই পারবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে কোটা পূরণ হবে না, কোটার যেটা খালি থাকবে, তা মেধার তালিকা থেকে নিয়োগ হবে। এটা আমরা করে দিয়েছি। গত কয়েক বছর থেকেই এই প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।’
ভিসির বাড়িতে ভাঙচুর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা আন্দোলনকারীদের মধ্যে যারা ভিসির বাড়িতে ভাঙচুর ও আক্রমণ করেছে তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। উচ্ছৃঙ্খলতা কখনো বরদাশত করা যায় না। ভাঙচুরকারীরা ভিসির বাড়ির ক্যামেরার চিপস নিয়ে গেলেও আশপাশে থাকা ক্যামেরা দেখে তাদের একটা একটা করে খুঁজে বের করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও আক্রমণ করেছে, তাদের তো ছাড়া হবে না। তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তদন্ত করা হচ্ছে। অনেকে স্বীকারও করছে। যত আন্দোলনই হোক না কেন, এদের ছাড়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে।
কোটা আন্দোলনকারীরা কী চায়, তা সঠিকভাবে বলতে পারে না উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, কোটা নিয়ে আন্দোলন। এটা কী আন্দোলন? ঠিক তারা যে কী চায়, বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, সেটা কিন্তু সঠিকভাবে বলতে পারে না।
তিনি বলেন, আজকে আন্দোলন তারা করছে খুব ভালো কথা। বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ছেলেপুলে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু ভিসির বাড়িতে আক্রমণ করে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, গাড়িতে আগুন দিয়ে পোড়ানো, বাড়ি ভাঙচুর করা, বেডরুম পযর্ন্ত পৌঁছে ভাঙচুর এবং লুটপাট করা, স্টিলের আলমারি ভেঙে গয়না, টাকা-পয়সা সব কিছু লুটপাট করেছে। ভিসির পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে লুকিয়ে থেকে প্রাণ বঁাচিয়েছেন। এটা কি কোনো শিক্ষাথীর্র কাজ? এটা কি কোনো শিক্ষাথীর্ করতে পারে?
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কথায় কথায় তারা বলে ক্লাস করবে না। ক্লাসে তালা দেয়, ক্ষতিগ্রস্ত কারা হবে? আমরা সেশনজট দূর করেছি। এদের কারণে এখন আবারও সেই সেশনজট। ১৫ টাকা সিট ভাড়া আর ৩৮ টাকা খাবার, কোথায় আছে পৃথিবীর। আজ নতুন নতুন হল বানিয়েছি। ১৫ টাকা সিট ভাড়া আর ৩৮ টাকায় খাবার খেয়ে তারা লাফালাফি করে। তাহলে সিট ভাড়া আর খাবারে বাজারদর যা রয়েছে, তাদের তা দিতে হবে। সেটা তারা দিক।’
মধ্যরাতে হল থেকে ছাত্রীরা বেরিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যরাতে হল থেকে ছাত্রীরা বেরিয়ে যাবে। টেনশনে আমি বঁাচি না। আমি পুলিশকে, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকমীের্দর বলেছি- এই মেয়েদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
তিনি বলেন, ‘বলেছি, কোটা সংস্কার আমরা করব। আমি তো বলেছি টোটাল কোটা বাদ দিতে। আমরা তো কেবিনেট সেক্রেটারিকে দিয়ে একটি কমিটিও করে দিয়েছি। তারা সেটা দেখছে। তাহলে এদের অসুবিধাটা কোথায়?’
এদিকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ।
বৃহস্পতিবার সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সরকারপ্রধানের প্রতি এই আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
রওশন বলেন, ‘কোটা নিয়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে অনেক বিভ্রাট দেখা যাচ্ছে। কোটা নিয়ে আন্দোলন করছে। তারা তো আমাদের সন্তান। তারা তো আবদার করবেই। তারা তো চাকরি চাইবে। তাদের চাকরিতে যেমন করে হোক প্রোভাইড করতে হবে। চাকরি দিতে হবে।
‘প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সচেতন আছেন চেষ্টা করছেন। মাননীয় স্পিকারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব তিনি যেন সহানুভ‚তির দৃষ্টি নিয়ে এই বিষয়টি বিবেচনা করেন।’
চলতি অধিবেশনের বাজেট বক্তৃতাতেও প্রধামন্ত্রীর প্রতি একই আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতীয় পাটির্র জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান রওশন।
সংসদে পাস হওয়া বাজেট প্রসঙ্গে রওশন বলেন, ‘বাজেটে প্রণোদনা নেই। ব্যাংক লুটপাটকারীদের কর কমানো হয়েছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট চলছে। মানুষের করের টাকায় দিতে হচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। ব্যাংক খাতের নৈরাজ্য বন্ধ করতে হলে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। ১৬ লাখ মানুষ ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে।’
সংসদে বক্তব্য দিতে উঠলে রওশন সবসময় খাদ্যে ভেজালের প্রসঙ্গ তোলেন। সেই প্রসঙ্গ বৃহস্পতিবারও তোলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুযোগ করে তিনি বলেন, ‘যতবারই বলি প্রধানমন্ত্রী হেসে উড়িয়ে দেন। হেসে উড়িয়ে দেয়ার কথা না। ডিজিটাল বাংলাদেশ কীভাবে গড়বেন? আবহাওয়া পযর্ন্ত দূষিত। নদী ভালো রাখেনি। আবহাওয়ায় সীসা। এগুলো দেখতে হবে।’
রাজধানীতে যানজট নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা ‘সাহস’ করে কথা বলতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন বিরোধী নেতা।
‘প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি চলাচল করলে রাস্তা বন্ধ রাখা হয়। রাস্তায় যানজট ছাড়তে ছাড়তে রাত হয়ে যায়। অন্য রাস্তায় যাওয়ই যায় না। বৃষ্টিতে সব রাস্তা ভাঙা। কেউ বলে না সাহস করে। এখানে যারা আছেন সবাই জানেন। রোডস হাইওয়ে মন্ত্রী আছেন। কিন্তু কারও সাহস নেই বলার। সবাই যানজটে নাকাল থাকে।’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নদী থেকে বালু তুলছে। আপনি জনগণের নেতা আপনি বের হয়ে দেখতে না পারলে কিভাবে হবে। বের হয়ে দেখেন। আপনাকে রোধ করতে হবে এগুলো। আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছি আমরা। কত ঝুঁকি নিয়ে নিবার্চন করেছি। আপনি জাতির পিতার কন্যা। আমার কাছে ক্ষমতা থাকলে আমি দেখতাম।’
অথর্বছর পরিবতের্নর দাবি করে রওশন বলেন, ‘অথর্বছর পবিতের্নর কথা বলতে চাই। ব্রিটেনে অথর্বছর শুরু হয় এপ্রিল মাসে। যুক্তরাষ্ট্রে অক্টোবরে। বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী জানুয়ারি-এপ্রিল মাসে হতে পারে। যখন অর্থবছর শুরু হয় তখন বৃষ্টি আসে। কাজ ঠিকমত করতে পারি না। অথর্বছর পরিবতের্নর বিষয়ে সবাই বিবেচনা করবেন।
সংবাদ সম্মেলনের আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মীদের ওপর আজ শনিবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, ছাত্রলীগ এ হামলা চালিয়েছে। তাঁদের এক নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে তুলে নিয়ে ছাত্রলীগ অজ্ঞাত স্থানে রেখেছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ছাত্রলীগ বলছে, আন্দোলনকারীদের একটি গ্রুপ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সাধারণ ছাত্ররা তাঁদের প্রতিহত করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আজ বেলা ১১টার সময় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। সংবাদ সম্মেলনের আগে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে মারধর করা হয়।
মারধরের একপর্যায়ে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক।
সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের ভাষ্য, আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল থেকে পরিষদের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মশিউর রহমানকে ছাত্রলীগের কয়েকজন তুলে নিয়ে গেছেন। তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের হামলায় তাঁদের ১২-১৩ জন কর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক, আতাউল্লাহ, আরিফ, মামুন ও জসিমের নাম বলেন তিনি।
এর আগে হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেলা ১১টার দিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আমাদের ওপর পিস্তল ও রামদা নিয়ে হামলা চালায়। আমরা তাদের কাছে এটা প্রত্যাশা করিনি।’ রাশেদ খান ওই সময় আরও বলেন, সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে পরে জানানো হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের ভাষ্য, বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে উপস্থিত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। এ সময় মুখোমুখি অবস্থান নেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় আন্দোলনকারীদের পাঁচ-ছয়জনকে মারধর করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, দুপুর ১২টার কিছু পরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের মোহাম্মদ আরশ উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ‘ধর ধর’ বলে তাঁকে মারতে থাকেন। এ সময় তিনি জ্ঞান হারান। পরে তাঁকে রিকশায় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে দেখা যায়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা।
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, বেলা দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। তবে মোটরসাইকেলটি কার, তা জানা যায়নি।
এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপসম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, ‘কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট ঘোষণার পর যাঁরা আন্দোলনে ছিলেন, তাঁরা পড়ার টেবিলে ফিরে গেছেন। কিন্তু একটি গ্রুপ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের সাধারণ ছাত্ররা প্রতিহত করেছেন। আমরা প্রথমে ছাত্র, পরে ছাত্রলীগ। এ ঘটনা ছাত্রলীগ ঘটায়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তাঁদের প্রতিহত করেছেন।’
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারের ঘোষণার আড়াই মাসেও কোটা সংস্কারের কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এ নিয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আজ সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল।
![]() |
কুষ্টিয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৩০ নেতা-কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (২৯ জুন) রাত ৯টার দিকে কুষ্টিয়া মডেল থানা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ টিম বাড়িটিতে অভিযান চালায়।
অভিযানে নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজুর রহমান মিথুন, সাধারণ সম্পাদক এসআর শিপন, যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাব্বী, রফিকুল ইসলাম প্রশান্ত ও সাংগঠনিক সম্পাদক রোকনুজ্জামান রাসেলসহ অন্তত ৩০ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অপারেশন) ওবায়দুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, পুলিশের কাছে গোপন সংবাদ ছিল ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর বাড়িতে বিএনপির একদল নেতাকর্মী বিস্ফোরক দ্রব্যসহ নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওই সংবাদের ভিত্তিতেই সেখানে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বিএনপির ৩০ নেতা-কর্মীকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী ও সাধারণ সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের নবনির্বাচিত নেতারাসহ ৩৫-৪০ জন নেতাকর্মী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর সঙ্গে তার বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। এ সময় পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে নেতা-কর্মীদের আটক করে।
গত ০৫ জুন বাংলাদেশ জাতীয়াতাবাদী ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকরামুল হাসান ৬ জনের নাম উল্লেখ করে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটির অনুমোদন দেন।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য জননেতা কমরেড আবু হাসান টিপু বলেছেন, ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি হলে দেশ নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলায় পড়বে। জনগণ ৫জানুয়ািরর নির্বাচনের পূনরাবৃত্তি দেখতে চায়না। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই কায়দায় হলে দেশ এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলায় নিপতিত হওয়ার আশংকা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ১৪তম পুনর্গঠন বার্ষিকী উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলা অফিসে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
১৪তম পুনর্গঠন বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সভাতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি পলিট ব্যুরোর সদস্য জননেতা কমরেড আবু হাসান টিপু বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনক হলও সত্য, যে আওয়ামী লীগ একসময় ভাত ও ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে আজ তারাই জনগণের ভাত ও ভোটাধিকারের বিরুদ্ধেই অবস্থান গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আবু হাসান টিপু বলেন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যূনতম গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে বিদায় দিয়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে তারা সাধারণ নিয়মে পরিণত করেছে। মাদক বিরোধী বর্তমান অভিযানের লক্ষ্য মাদক নির্মুল নয়; লক্ষ্যটা রাজনৈতিক। আর তা হচ্ছে গণআতংক তৈরী করে নিজেদের পক্ষে আগামী নির্বাচনের জমিন তৈরী করা।
সভাপতি হিসাবে বক্তৃতাকালে শ্রমিকনেতা মাহমুদ হোসেন বলেন, সরকারের বেপরোয়া তৎপরতায় দেশের মানুষের জানমাল আজ গুরুতর হুমকির মুখে। সরকার মুখে উন্নয়নে কথা বললেও বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন নেই। তিনি অনতিবিলম্বে দমন-পীড়নের পথ পরিহার করে অবাধ নির্বাচনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির দাবী করে বলেন সময় এখনো একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। নির্বাচন কমিশনের সংলাপে বিপ্লবী ওয়র্কার্স পার্টি উত্থাপিত ২৩ দফা বাস্তবায়ন করুন।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি শ্রমিকনেতা মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- শহিদুল আলম নাননু, রাশিদা বেগম, সাইফুল ইসলাম হাবিবুর রহমান আঙ্গুর, নাজমুল হাসান নাননু, আইউব আলী, রোকসানা বেগম, মোক্তার হোসেন ও মুক্তা বেগম প্রমুখ।

ফরিদপুরে চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবীসহ বিভিন্ন মামলার ৪৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে ডিবি ও থানা পুলিশ। এ সময় ৫২৯ পিস ইয়াবা এবং ৪৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ অভিযান চালানো হয়।
জেলার ৯টি উপজেলার অভিযানে আটকদের মধ্যে মাদক মামলায় ১০ জন, মাদক সেবনকারী ১০ জন, নিয়মিত মামলায় ৩ জন, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত ২২ জন রয়েছেন। এতে বিভিন্ন থানায় মোট ৭টি মাদক মামলা রুজু হয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. জাকির হোসেন খান জানান, বুধবার দুপুরে আটকদের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান ও বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে অচিরেই কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গত দু’দিনে লন্ডনে দু’দফা বৈঠকে নবম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সরকার ও দলীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে বৈঠকে মির্জা ফখরুলকে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একমাত্র নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই বিএনপি নির্বাচনে যেতে পারে- এমন মনোভাবের কথা জানিয়ে তাকে এবং খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সজাগ থাকতে মির্জা ফখরুলকে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদ সোমবার সমকালকে বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লন্ডনে এসেছেন।
তিনি বলেন, মহাসচিব লন্ডনে এলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সূত্র জানায়, লন্ডন আসার পর এরই মধ্যে অন্তত দু’বার তারেক রহমানের লন্ডনের কিংস্টন এলাকার বাড়িতে গিয়েছেন মির্জা ফখরুল। একান্তে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে।
রোববার লন্ডনে রয়েল রেজেন্সি হলে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে তারেক রহমান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে মির্জা ফখরুল অংশ নেন। ইফতারের আগে আলোচনা সভায় দলের ভবিষ্যৎ আন্দোলন ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তারা কর্মীদের দিকনির্দেশনা দেন।
গত ৩ জুন চিকিৎসার জন্য স্ত্রী রাহাত আরা বেগমকে নিয়ে মির্জা ফখরুল ব্যাংকক যান। সেখানে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসা নেন তিনি। চিকিৎসা শেষে গত ৭ জুন স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকায় ফিরে আসেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন নয় মিথ্য ও প্রতারণার রোল মডেল। বর্তমান সরকার দেশের মানুষের সাথে মিথ্যা কথা বলে, প্রতারণা করে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অ্যাব আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও তার দলের নেতারা বলেন আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছি। বিশ্বের কাছে আমরা এখন উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু কিসের উন্নয়ন, কোথায় উন্নয়ন? জনগণের কথা বলার, ভোটের অধিকার নেই আর সকরার বলছে উন্নয়নের রোল মডেল। আসলে উন্নয়ন নয় বাংলাদেশ হচ্ছে মিথ্যা ও প্রতারণার রোল মডেল। তিনি বলেন, দেশের সব অর্থিক খাত ধ্বংস হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো লুট হয়ে গেছে। এসব আমার কথা নয়, সিপিডি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলো শেষ হয়ে গেছে অর্থনীতিতে ধ্বস নেমেছে। আর সরকার বলে উন্নয়নেরর জোয়ার বইছে, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আসলে এগুলো সবই জনগণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। সরকারের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, বর্তমান ভোটার বিহীন সরকারের অপশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গণ বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আর সে জন্য মানুষেরর কাছে যেতে হবে, তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। কারণ এ সরকার গোটা দেশের সব শেষ করে দিয়েছে। খালেদা জিয়াকে নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। একটি মানুষ আছেন যাকে কেন্দ্র করে মানুষ এগিয়ে যাওয়া প্রেরণা পায়। আন্দোলন ও ভোটের অধিকার ফিরে পেতে প্রেরণা পায়। বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও পালন করতে দেয়না মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা যেখানেই প্রোগ্রাম করতে চাই সেখানে বাধা দেয়া হয়। কোথাও জড় হলে বলে এখানে সভা সমাবেশ করা যাবে না, কারণ কি এখানে নাকি নাশকতা হবে। সরকার ও প্রশাসনের কথায় মনে হয় তারা সবাই জ্যোতিষ, আচার্য। তিনি বলেন, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশালে, রাজশাহীতে আমাদের ১ ঘণ্টা আগে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। খুলনা, বরিশালে বলছে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। যখন বলা হলো গোটা শহরে সমাবেশ হবে পারলে গুলি করেন তখন তারা সরে যায়। আসলে যেখানে প্রতিরোধ সেখানে সরে যায়। মনে রাখতে হবে প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। এমনকি মানুষের সব শেষ আশ্রয় বিচারালয় ও তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আমাদের এখন বলতে বাধা নেই নিম্ন আদালতের বিচারকরা অপেক্ষায় থাকে কখন উপরের মহল থেকে নির্দেশ আসবে তখন রায় ঘোষণা করবে। উচ্চ আদলতের ওপর একটা আস্থা ছিলো, কিন্তু খালেদা জিয়ার মামলায় জামিনের বিষয়ে তারাও সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে জামিন স্থগিত করলে। এটি সম্পূর্ণ নজির বিহীন। রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সব বিরোধী দল একমত হয়েছে বর্তমান সরকারেরে অধীনে সুষ্ঠু হবে না। তখন বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে কোনো দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তাহলে আজ কেন আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না? আমাদের সবাইকে আবার নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মানুষের গণতান্ত্রিক, নাগরিক ও ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশে যে অরাজক উপরিস্থ তার জন্য ভোটার বিহীন সরকার ব্যবস্থা দায়ী। আর সে জন্য আমরা বার বার বলছি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সে ব্যবস্থা এখনও করার কোনো প্রক্রিয়া আমরা দেখছি না। বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের বিষয়ে তিনি বলেন, মিথ্য মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে রাখা হয়েছে। নজির বিহীন ভাবে তার জামিন আটকে রাখা হয়েছে। তার জামিনও বিলম্বিত করছে। আমাদের দেশে আইনে আছে ৫ বছরেরে কম সাজ। হলে উচ্চ আদালত তাকে জামিন দিতে পারে। কিন্তু খালেদা জিয়ার বেলায় ত। করা হয়নি। উদ্দেশ্য তার কারাবাস দীর্ঘায়িত করা। তিনি বলেন, যখন বিচারপতি খাইরুল হক সংবিধান কাটা ছেড়া করে একটি বিতর্কিত রায় দিয়েছে তখনই দেশে সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ ওই রায়ের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে ভোটার বিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম করে দিয়েছে। ফখরুল বলেন, আবারও একদলীয় শাসন ফিরিয়ে আনার মূল হোতা বিচারপতি খাইরুল হক। তার পরে যারা এসেছেন তারা সবাই এটাকে আবার বহাল করতে কাজ করছেন। এটা একটি ষড়যন্ত্র একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার। প্রতিবাদ সভায় আরো বক্তব্য রাখেন পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ও আমারদেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ড্যাব মহাসচিব এ জেড় এম জাহিদ হোসেন।
সম্প্রতি ভারত সফর করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর। ছবি: সংগৃহীতবিএনপি কি তার ভারতবিরোধী অবস্থান পাল্টাচ্ছে? দলটির কয়েকজন নেতার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে এ প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে গিয়ে দলের এক নেতা বলে ফেলেছেন, সরকারে থাকার সময় ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরী আচরণ ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ ছিল’।
বিএনপির তিন নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সম্প্রতি দিল্লি গিয়েছিলেন। বাংলাদেশে ‘প্রকৃত গণতান্ত্রিক আবহ প্রতিষ্ঠায়’ সাহায্য করার আরজি নিয়েই তাঁরা সেখানে যান।
বিএনপির নেতাদের এই সফরের পর দলটির অনেক নেতাই বলছেন, এর মাধ্যমে তাঁদের দল ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসছে। বিশেষ করে ভারতের গণমাধ্যমে হুমায়ুন কবীরের দেওয়া বক্তব্য ‘ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরী আচরণ ভুল ও বোকামিপূর্ণ ছিল’ কথাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলছেন দলের নেতারা। কেননা হুমায়ুন কবীর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন। আর তারেক রহমানই এখন দলের সবকিছু। ফলে সেখান (তারেক রহমান) থেকে যে ভারত বিষয়ে বিএনপির অবস্থানই দলের অবস্থান হবে, এটাই স্বাভাবিক।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, সম্পর্কটা কখনো একপক্ষীয় হয় না। এটা দুই পক্ষ থেকেই আসতে হয়। বিএনপি ভারতে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের কাছে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যেসব বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেগুলো দূর করেছে। কিছু আশ্বাসও দিয়েছে। দেশটির থিংকট্যাংক হিসেবে পরিচিত কয়েকটি সংগঠনের কাছেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। বিএনপির ওই নেতা বলেন, তাঁদের মতো ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোও চায় বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনঅবশ্য এই সফর সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, দলের পক্ষ থেকে কেউ ভারতে গেছেন বলে তিনি জানেন না।
তারপরেও নির্বাচনের আগে ভারতে বিএনপির এ সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক এবং প্রধান দুই দলের তাত্ত্বিকেরা। তাঁরা বলছেন, চলমান বাস্তবতা বুঝে বিএনপি তাদের ভারতবিরোধিতার নীতিতে পরিবর্তন আনছে। বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসছে—এই সফর ও সেখানে গিয়ে তাঁদের কথাবার্তায় তা স্পষ্ট বলেও মনে করেন কেউ। তবে কেউ কেউ আবার মনে করছেন, এ সফর বা নমনীয় আচরণ কেবল নির্বাচনী কৌশল। দলটি এখনো নানা কর্মকাণ্ডে অকারণ ভারতবিরোধিতায় মেতে থাকে।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ‘পেছনে না তাকিয়ে আমাদের সামনের দিকে তাকানো উচিত। গত শতকের ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতি এখন বাতিল হয়ে গেছে।’ ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতিটা আসলে কী, তা আরও স্পষ্ট করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর। বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে খারাপ সম্পর্ক ছিল, তা ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ’ নীতির ফসল। পত্রিকাটিকে হুমায়ুন কবীর এ-ও বলেছেন, ‘তারেক রহমান চান, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলি।’
হুমায়ুন কবীরের এ মন্তব্য সম্পর্কে বিএনপির নেতা খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘তাঁকে আমি চিনি না। কে কোথায় কী বলল, তার ব্যাখ্যা আমি দেব না।’
দ্য হিন্দু পত্রিকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘বড় প্রতিবেশী ভারতের গঠনমূলক ভূমিকা চায় বিএনপি। কোনো একটি দলকে ভারত সহায়তা করুক, এটাও চায় না।’
উল্লেখ্য, ভারতবিরোধিতা বিএনপির রাজনীতির একটি বড় অনুষঙ্গ। দলটির উদ্ভব, বিকাশ, নির্বাচনী কর্মকাণ্ড, এমনকি নিত্যদিনের রাজনৈতিক বিবৃতিতে এ বিরোধিতার উদাহরণ স্পষ্ট। বিএনপি তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে ভারতের কাছে নতজানু বলে বরাবরই কোণঠাসা করতে চেয়েছে।
সাম্প্রতিক সফর সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের বিভিন্ন থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ ও সেখানকার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যে সংকট চলছে, সে সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মতো ভারতও এ দেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য কী প্রয়োজন, সে সম্পর্কে বিএনপির চাওয়াগুলো তাদের জানানো হয়েছে।
বিএনপির সঙ্গে ভারতের দূরত্ব কমেছে কি না, সে সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির কোনো নেতাই সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তাঁরা বলেছেন, এই সফর ভবিষ্যতে ইতিবাচক ধারার সূচনা করবে। ভারতের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ বাড়াবে। হঠাৎ ভারতের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর ব্যাপারে বিএনপির আগ্রহের কারণ কী, জানতে চাইলে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভৌগোলিক ও বিশ্বে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দেশটিকে এড়িয়ে বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নও কঠিন। তা ছাড়া ঢালাও বিরোধিতা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলে না। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যাপারে ভারতের নেতিবাচক অবস্থান রয়েছে। ভবিষ্যৎ দলীয় প্রধানের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশটির অবস্থান ইতিবাচক হওয়া দরকার। এটিও বিএনপির চিন্তায় রয়েছে।
এযাবৎকালের রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে নিবিড় বাণিজ্য ও কানেকটিভিটির বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখেছেন, কোনো সুনির্দিষ্ট এবং একক কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিকে পৃথক করা যায় তা হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দলটির ভারতবিরোধী মনোভাব। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটির ভিত্তিমূল ছিল এই বিরোধিতা।
তবে ভারতের গত সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই বিএনপি ভারত সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ী হওয়ার লক্ষণ টের পেয়ে দেশের বিএনপিমনস্ক সংখ্যালঘুদের একটি দলকে ভারতে পাঠায় বিএনপি। হিন্দু মহাজোট নামের সংগঠনের একটি অংশকে বিএনপি পেছনে থেকে সমর্থন করে। তাদের আমন্ত্রণে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার নেতা এবং বর্তমানে ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায় বাংলাদেশে আসেন। হিন্দু মহাজোটের একাধিক নেতা এ প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তথাগত রায় হিন্দু মহাজোটের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে নেননি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি এবং আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কয়েকজন সংখ্যালঘু নেতা কাজ করেন। এরপরও কয়েকজন বিএনপি নেতা একাধিকবার ভারত সফরে গেছেন। তবে এবারের সফর, তা যদি দলীয় সিদ্ধান্তে না-ও হয়, এরপরও এমন খোলামেলা কথা কোনো বিএনপি নেতা বলেননি। এর কারণ কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদবিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ বলছেন, ‘রাজনীতি কোনো নিশ্চল বিষয় নয়। এটি গতিশীল। বিএনপির একটি রাজনৈতিক অবস্থান ছিল ভারত প্রশ্নে। পরিবর্তিত সময়ে সেটিও পরিবর্তিত হয়েছে। এটি ইতিবাচক লক্ষণ।’ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভারত প্রশ্নে বিএনপির আগের নীতিকে ভুল বলে চিহ্নিত করা যাবে না। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি অবস্থান মাত্র।
আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো কর্মকাণ্ডকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে বিএনপি। বিএনপি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে ‘দাসত্বের চুক্তি’ বলে বারবার সমালোচনা করে এসেছে। ১৯৯৭ সালে এ চুক্তি শেষ হওয়া পর্যন্ত একে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করে গেছে বিএনপি। ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তিকে বিএনপি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করেছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষর হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে বিএনপি। খোদ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, পার্বত্য চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ক্ষমতায় গেলে ফারাক্কা ও পার্বত্য চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতিও দেয় বিএনপি; যদিও তা তারা করেনি।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশ ভারত হয়ে যাবে। এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তৃতায় শুধু নয়, বিভিন্ন সময় রূঢ় আচরণে বিএনপি ভারতের প্রতি তার নেতিবাচক মনোভাব তুলে ধরে। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এলে আগে থেকে নির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাতে যাননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
বিএনপির আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল দেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চোরাচালান ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজারের (সিইউএফএল) জেটিঘাটে খালাস করার সময় ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি আটক করে টহল পুলিশ। অস্ত্রের চালানটি উলফার জন্য যাচ্ছিল। এ নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দুটি মামলার রায় দেন আদালত। এর মধ্যে একটিতে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের ফাঁসির আদেশ দেন।
বিএনপি ভারতের সহানুভূতি পেতে আগ্রহী কেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, নির্বাচনে জিততে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক দরকার। এ জন্য সব দল এই দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে, এটা দেখাতে চায়।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ মনে করেন, বিএনপির এই সফর এবং সেখানে গিয়ে আন্তরিক কথা বলায় একটি কথা স্পষ্ট—বিএনপি নির্বাচনে আসছে। তিনি মনে করেন, ভারতের কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক আছে। এখন সেখানে ক্ষমতায় বিজেপি এসেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে যে পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল, সেই স্তরে আছে, এমনটা না-ও হতে পারে। এখন বিএনপি হয়তো বিজেপিকে বোঝাতে চাইবে যে তারা কংগ্রেস-বৈরী ছিল। বিজেপির সঙ্গে তাদের বৈরিতা নেই।
বিএনপি কি আসলেই ভারতবিরোধী অবস্থান পাল্টাচ্ছে, নাকি সামনে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বলছে? কেননা একেবারে সাম্প্রতিক সময়েও তাদের একাধিক নেতা তাঁদের ভারতবিরোধী চিরাচরিত অবস্থানের আদলেই কথা বলেছেন।
গত ২৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকারি অর্থ ব্যয় করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের কাছে আকুতি জানাতে ওই সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। গণমাধ্যমের খবরে এটা পরিষ্কার, প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে ভারতে যাননি, তিনি তিস্তার পানিচুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে যাননি। তিনি ভারতে গেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেনদরবার করার জন্য।’
ভারত সফর শেষ করে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সফর নিয়ে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনার বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, সেটা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। প্রতিদিনের বোমাবাজি, গুলি; আমরা কিন্তু ওদের শান্তি ফেরত দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই আমরা ওগুলোর প্রতিদান চাই না।’
শেখ হাসিনা ‘প্রতিদিনের বোমাবাজি, গুলি’ বলতে মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বন্ধে তাঁর সরকারের সহযোগিতার কথাই উল্লেখ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা থেকে ধরা হয় আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা অনুপ চেটিয়াকে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর উলফা, টিএনভি, এনএলএফটিসহ একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে সহিংসতা অনেকটাই কমে এসেছে।
তবে ভারতকে দেওয়া এসব সহযোগিতা নিয়ে শেখ হাসিনার কথারও সমালোচনা করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পরদিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই যে বলেছেন ভারতকে অনেক দিয়েছেন। আমরা ভালো করে জানি না। আপনি দয়া করে কী কী ভারতকে দিয়েছেন, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করুন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার মনে করেন, এবার বিএনপির কয়েকজন নেতা ভারতে গিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা হয়তো নির্বাচনের আগে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়াস। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে এলে বিএনপি ভারত প্রশ্নে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ নমনীয় হয়। আবার তাদের সারা বছরের কর্মকাণ্ডে ভিন্ন ধরনের চিত্র লক্ষ করেছি।’ এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শান্তনু বলেন, ‘২০১২ সালের শেষ দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। পরে অবশ্য তাঁদের কথাবার্তায় পরিবর্তন দেখেছি।’ তিনি মনে করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে যেকোনো দলের স্থায়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থাকা দরকার।
বিএনপির কয়েক নেতার ভারত সফরে গিয়ে মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি সত্য কথা বলে, এমন প্রমাণ কমই আছে। আমার ধারণা, তাদের নেতারা যে কথা ভারতে বলেছেন, তা তাঁদের দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্তের নয়।’ তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতারা যদি এমন বলেই থাকেন যে তাঁদের অতীত ভারত-নীতি ভুল ছিল, তাহলে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে তারা এত দিন যে নিছক প্রচারণা চালিয়েছেন, তা প্রমাণিত হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খানবিএনপির এ সফর দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামে কি না, তা নিয়ে ফারুক খানের সন্দেহ সঠিক বলেই মনে হলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফের কথায়। দলীয় নীতিনির্ধারণী সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির নেতাদের এই সফর না হলেও এটা যে নেহাত কারও ব্যক্তি উদ্যোগের সফর, তা মনে করেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বরং সেখানে গিয়ে বিএনপি নেতারা যে কথাগুলো বলেছেন, তাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তাঁরা। অধ্যাপক ইমতিয়াজ উদ্দিন মনে করেন, দুটি বড় দেশের মধ্যে চীন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের মতৈক্য আছে। এবার ভারত প্রশ্নে তা এলে বরং ভালো।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বিএনপি হয়তো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির চলমান প্রবণতা বুঝতে পেরেছে। তাই ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়াস নিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সব সময় তাদের একই অবস্থান ধরে রাখবে—এটা বাস্তবতাও নয় বলে তিনি মনে করেন। দেশীয় রাজনীতি শুধু নয়, আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তা ইতিবাচক।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ভারতবিরোধিতা বিএনপির নির্বাচনী রাজনীতিতে সব সময় মূল বিষয় থেকেছে।’ একটা সমর্থক বা ভোটার শ্রেণি এত দিন ভারতবিরোধী চেতনার ধারক বলে বিএনপিকে বিশ্বাস করত বা সে জন্যই তারা বিএনপিকে ভোট দিত। এখন বিএনপির ভারত প্রশ্নে অবস্থানের পরিবর্তন তাদের কি বিএনপিবিমুখ করবে? অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, ‘বিএনপি তাদের সমর্থকদের পরিবর্তিত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হবে।’