লন্ডন সময় বেলা ১১টা। অফিসে কাজের ফাঁকে অনলাইন পত্রিকায় প্রিয় মাতৃভূমির আপডেট খবর পড়ছিলাম। শীর্ষনিউজ অনলাইনটি খুলতেই নজরে এলো প্রথম চারটি সংবাদই ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সংক্রান্ত। এর তিনটিই হলো পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত। নিহত ১, আহত অনেক। গোলাগুলি, বাড়িতে হামলা, হাসপাতালে ভর্তির তথ্য জানা গেল। ঘটনা তিনটি কুমিল্লা, সোনারগাঁও এবং শরীয়তপুরে।
নিজ দলের সহকর্মীদের গুলিতে নারায়নগঞ্জে জীবন হারালো যুবলীগ কর্মী জামাল। একজন নিপিড়িত সাংবাদিক হিসেবে মরহুম জামালের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে জামালের হাতে এর আগে কারো জীবন সংহার হয়েছে কি-না, আমার জানা নেই; তবে জীবনের বিদায়বেলা তিনি নিপিড়নের শিকার হয়েছেন, এমনকি তার সবচেয়ে মূল্যবান জীবনটিও কেড়ে নেয়া হলো। ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি শহীন কি-না, সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারছি না। কেননা জামালের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই, তার পূর্ব কর্মকান্ড সম্পর্কেও আমি তেমন জানি না। কোনো ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি রাজনীতি করে থাকলে, এই সংঘর্ষে অংশ নেয়ার পেছনে ভাল কোনো উদ্দেশ্য থাকলে তিনি শাহাদতের মর্যাদা পেতেও পারেন। যেহেতু এসব সম্পর্কে আমার জানা নেই, সেহেতু একজন মানবের হত্যার শিকার হওয়া, এই যুবকের জীবন কেড়ে নিয়ে একটি পরিবারকে শোকে ভাসানো কিংবা একজন মায়ের বুক খালি করার জন্য যারা দায়ী, তাদের পাপের শাস্তি চাওয়ায় আমার কোনো দোষ হবে বলে আমি মনে করি না।
সবকিছু মিলিয়ে যুবলীগ কর্মী জামাল মৃত্যুকালে আওয়ামী জাহিলিয়াতের অস্ত্র-সন্ত্রাসের শিকার হলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীরা যেমনটি হয়েছেন, হচ্ছেন। বিশেষ করে গত সাত বছরে সহস্রাধিক ব্যক্তি আওয়ামী অস্ত্রধারী ক্যাডার এবং সরকারি বাহিনীতে যোগ দেয়া ক্যাডারদের গুলিতে জীবন দিয়েছেন। আমি জামালের মা/স্ত্রীর আকুতির প্রতি সহমর্মিতা জানাই।
আওয়ামী খুনী ক্যাডারদের মায়েদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, আপনারা কান পেতে শুনুন আমার ভাই সুমনের মা, স্ত্রী ও সন্তানের আর্তনাত। ক’দিন আগেও জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে মিডিয়ার সামনে এসে বিলাপ করে গেছেন সম্প্রতি গুম-খুনের শিকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মা, স্ত্রী ও শিশু সন্তানেরা। মাসুম বাচ্চার আর্তনাত সহ্য করা যায় না। সেদিন গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা মো. জহিরের মা হোসনে আরা বেগম বলেন, আমার সন্তানের খোঁজ এখনও পাইনি। তার বাবা মৃতপ্রায়। আমরা ছেলের সন্ধান চাই। এমনিতেই সন্তানের খোঁজ পাইনি তার ওপর প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ বাসায় গিয়ে টাকা চায়। আমরা আর কান্না করতে পারব না। সরকারকে বলব আমাদের সন্তানদের ফেরত দিন। রাজধানীর ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি খালিদ হাসান সোহেলের স্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি কবে সোহেল ফিরে আসবে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার স্বামীকে ফেরত দিন। গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা পারভেজের চার বছরের শিশুকন্যা হৃদি বলে, শেখ হাসিনা আন্টি, আপনি আমার পাপাকে ছেড়ে দিন। আমরা আপনার জন্য দোয়া করব।
প্লিজ পাপাকে ছেড়ে দিন। আমি স্কুলে যাব, চকলেট খাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা চঞ্চলের পাঁচ বছরের ছেলে আহাদ আলী বলে, শেখ হাসিনা আন্টি, আপনি আমার পাপাকে ছেড়ে দিন। পাপাকে ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না। মা-দাদা পাপার জন্য সব সময় কাঁদে। তেজগাঁওয়ের গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আমার ভাই নিখোঁজ হয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের দিকে ফিরে তাকান। গুম হওয়া পরিবারগুলোর সদস্যরা বাঁচতে চায়।
এরকম হাজার হাজার পরিবারে এখন কান্নার রোল চলছে। এ কান্না বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। যারা গুম-খুনে জড়িত, তাদের মা, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি আমার আবেদন- আপনারা রুখে দাড়ান। পুলিশ, র্যাব, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী আপনাদেরও জীবন আছে। আপনি যদি গুম হয়ে যান, যুবলীগ কর্মী জামালের মতো নিহত হন, এই খুন-খারাবি করে আপনার কি লাভ?
গুম-খুনে অংশ নেয়া পুলিশ, র্যাব, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের মা-স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি আবেদন জানােবা, আপনারা ওদের সামলান। যারা এসব বাহিনী ও সংগঠনে জড়িত, তাদের লাগাম টেনে ধরুন। নইলে একে একে ওরা পারস্পরিক নিজেদেরকেই হত্যা করবে। যা আপনারা নারায়ানগঞ্জে সাত মার্ডারে দেখেছেন। দেশজুড়ে দেখছেন। এরপর বাতাস ঘুরে গেলে আরো ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হলে আপনাদের চোখের পানি কে মুছবে? এসব ভাবুন। প্রিয় মা, আপনার লাগামহীন সন্তানকে; প্রিয় বোন, আপনার খুনী স্বামীকে; প্রিয় সোনামনি, তোমার সন্ত্রাসী বাবাকে ভাল পথে থাকতে বলো। ভাল পথে ফিরতে বলো। শান্তির পথ পরিবারকেও শান্তি দেবে। অনেক ক্ষমতা ও টাকা-পয়সা তোমাদের সুন্দর বাড়ি, গাড়ি, বাসা, পোশাক ও খাবার দেবে, কিন্তু পরিবারে শান্তি দেবে না। যা তোমরা এখন প্রতিদিনই উপভোগ করছো। অশান্তির নিড় হয়ে উঠছে প্রতিটি খুনী র্যাব-পুলিশ সদস্যের পরিবার। যুবলীগ-ছাত্রলীগের মধ্যে গুম-খুনে অংশ নেয়া কর্মীদের পরিবার।
শুধু ক্ষমতা ও অবৈধ পথে উপার্জন আর ভোগে শান্তি নেই; প্রকৃত শান্তির পথ খুঁজুন। সবাই মিলে একটি শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নিন। যাদেরকে হত্যা করেছেন, তাদের কাছে ক্ষমা চান। এই জনপদে রক্ত ঝরানো বন্ধ করতে হবে। রক্তাক্ত জনপদ হয়ে উঠুক পারস্পরিক ভালবাসায় সিক্ত ফুলের বাগান। শান্তির নিড় হয়ে উঠুক প্রতিটি পরিবার। হিংসা-প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ কারো জন্যই শুভ নয়। আপনাদের সকলের প্রতিটি মুহূর্ত শুভ হোক, এই প্রত্যাশায়।