‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান বদলাচ্ছে বিএনপি?

সম্প্রতি ভারত সফর করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর। ছবি: সংগৃহীতসম্প্রতি ভারত সফর করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর। ছবি: সংগৃহীতবিএনপি কি তার ভারতবিরোধী অবস্থান পাল্টাচ্ছে? দলটির কয়েকজন নেতার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে এ প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে গিয়ে দলের এক নেতা বলে ফেলেছেন, সরকারে থাকার সময় ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরী আচরণ ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ ছিল’।

বিএনপির তিন নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সম্প্রতি দিল্লি গিয়েছিলেন। বাংলাদেশে ‘প্রকৃত গণতান্ত্রিক আবহ প্রতিষ্ঠায়’ সাহায্য করার আরজি নিয়েই তাঁরা সেখানে যান।

বিএনপির নেতাদের এই সফরের পর দলটির অনেক নেতাই বলছেন, এর মাধ্যমে তাঁদের দল ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসছে। বিশেষ করে ভারতের গণমাধ্যমে হুমায়ুন কবীরের দেওয়া বক্তব্য ‘ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরী আচরণ ভুল ও বোকামিপূর্ণ ছিল’ কথাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলছেন দলের নেতারা। কেননা হুমায়ুন কবীর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন। আর তারেক রহমানই এখন দলের সবকিছু। ফলে সেখান (তারেক রহমান) থেকে যে ভারত বিষয়ে বিএনপির অবস্থানই দলের অবস্থান হবে, এটাই স্বাভাবিক।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, সম্পর্কটা কখনো একপক্ষীয় হয় না। এটা দুই পক্ষ থেকেই আসতে হয়। বিএনপি ভারতে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের কাছে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যেসব বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেগুলো দূর করেছে। কিছু আশ্বাসও দিয়েছে। দেশটির থিংকট্যাংক হিসেবে পরিচিত কয়েকটি সংগঠনের কাছেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। বিএনপির ওই নেতা বলেন, তাঁদের মতো ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোও চায় বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনবিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনঅবশ্য এই সফর সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, দলের পক্ষ থেকে কেউ ভারতে গেছেন বলে তিনি জানেন না।

তারপরেও নির্বাচনের আগে ভারতে বিএনপির এ সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক এবং প্রধান দুই দলের তাত্ত্বিকেরা। তাঁরা বলছেন, চলমান বাস্তবতা বুঝে বিএনপি তাদের ভারতবিরোধিতার নীতিতে পরিবর্তন আনছে। বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসছে—এই সফর ও সেখানে গিয়ে তাঁদের কথাবার্তায় তা স্পষ্ট বলেও মনে করেন কেউ। তবে কেউ কেউ আবার মনে করছেন, এ সফর বা নমনীয় আচরণ কেবল নির্বাচনী কৌশল। দলটি এখনো নানা কর্মকাণ্ডে অকারণ ভারতবিরোধিতায় মেতে থাকে।

বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ‘পেছনে না তাকিয়ে আমাদের সামনের দিকে তাকানো উচিত। গত শতকের ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতি এখন বাতিল হয়ে গেছে।’ ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতিটা আসলে কী, তা আরও স্পষ্ট করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর। বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে খারাপ সম্পর্ক ছিল, তা ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ’ নীতির ফসল। পত্রিকাটিকে হুমায়ুন কবীর এ-ও বলেছেন, ‘তারেক রহমান চান, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলি।’

হুমায়ুন কবীরের এ মন্তব্য সম্পর্কে বিএনপির নেতা খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘তাঁকে আমি চিনি না। কে কোথায় কী বলল, তার ব্যাখ্যা আমি দেব না।’
দ্য হিন্দু পত্রিকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘বড় প্রতিবেশী ভারতের গঠনমূলক ভূমিকা চায় বিএনপি। কোনো একটি দলকে ভারত সহায়তা করুক, এটাও চায় না।’

উল্লেখ্য, ভারতবিরোধিতা বিএনপির রাজনীতির একটি বড় অনুষঙ্গ। দলটির উদ্ভব, বিকাশ, নির্বাচনী কর্মকাণ্ড, এমনকি নিত্যদিনের রাজনৈতিক বিবৃতিতে এ বিরোধিতার উদাহরণ স্পষ্ট। বিএনপি তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে ভারতের কাছে নতজানু বলে বরাবরই কোণঠাসা করতে চেয়েছে।

সাম্প্রতিক সফর সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের বিভিন্ন থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ ও সেখানকার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যে সংকট চলছে, সে সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মতো ভারতও এ দেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য কী প্রয়োজন, সে সম্পর্কে বিএনপির চাওয়াগুলো তাদের জানানো হয়েছে।

বিএনপির সঙ্গে ভারতের দূরত্ব কমেছে কি না, সে সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির কোনো নেতাই সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তাঁরা বলেছেন, এই সফর ভবিষ্যতে ইতিবাচক ধারার সূচনা করবে। ভারতের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ বাড়াবে। হঠাৎ ভারতের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর ব্যাপারে বিএনপির আগ্রহের কারণ কী, জানতে চাইলে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভৌগোলিক ও বিশ্বে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দেশটিকে এড়িয়ে বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নও কঠিন। তা ছাড়া ঢালাও বিরোধিতা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলে না। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যাপারে ভারতের নেতিবাচক অবস্থান রয়েছে। ভবিষ্যৎ দলীয় প্রধানের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশটির অবস্থান ইতিবাচক হওয়া দরকার। এটিও বিএনপির চিন্তায় রয়েছে।

এযাবৎকালের রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে নিবিড় বাণিজ্য ও কানেকটিভিটির বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখেছেন, কোনো সুনির্দিষ্ট এবং একক কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিকে পৃথক করা যায় তা হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দলটির ভারতবিরোধী মনোভাব। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটির ভিত্তিমূল ছিল এই বিরোধিতা।

তবে ভারতের গত সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই বিএনপি ভারত সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ী হওয়ার লক্ষণ টের পেয়ে দেশের বিএনপিমনস্ক সংখ্যালঘুদের একটি দলকে ভারতে পাঠায় বিএনপি। হিন্দু মহাজোট নামের সংগঠনের একটি অংশকে বিএনপি পেছনে থেকে সমর্থন করে। তাদের আমন্ত্রণে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার নেতা এবং বর্তমানে ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায় বাংলাদেশে আসেন। হিন্দু মহাজোটের একাধিক নেতা এ প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তথাগত রায় হিন্দু মহাজোটের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে নেননি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি এবং আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কয়েকজন সংখ্যালঘু নেতা কাজ করেন। এরপরও কয়েকজন বিএনপি নেতা একাধিকবার ভারত সফরে গেছেন। তবে এবারের সফর, তা যদি দলীয় সিদ্ধান্তে না-ও হয়, এরপরও এমন খোলামেলা কথা কোনো বিএনপি নেতা বলেননি। এর কারণ কী?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমাদঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদবিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ বলছেন, ‘রাজনীতি কোনো নিশ্চল বিষয় নয়। এটি গতিশীল। বিএনপির একটি রাজনৈতিক অবস্থান ছিল ভারত প্রশ্নে। পরিবর্তিত সময়ে সেটিও পরিবর্তিত হয়েছে। এটি ইতিবাচক লক্ষণ।’ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভারত প্রশ্নে বিএনপির আগের নীতিকে ভুল বলে চিহ্নিত করা যাবে না। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি অবস্থান মাত্র।

আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো কর্মকাণ্ডকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে বিএনপি। বিএনপি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে ‘দাসত্বের চুক্তি’ বলে বারবার সমালোচনা করে এসেছে। ১৯৯৭ সালে এ চুক্তি শেষ হওয়া পর্যন্ত একে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করে গেছে বিএনপি। ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তিকে বিএনপি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করেছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষর হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে বিএনপি। খোদ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, পার্বত্য চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ক্ষমতায় গেলে ফারাক্কা ও পার্বত্য চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতিও দেয় বিএনপি; যদিও তা তারা করেনি।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশ ভারত হয়ে যাবে। এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তৃতায় শুধু নয়, বিভিন্ন সময় রূঢ় আচরণে বিএনপি ভারতের প্রতি তার নেতিবাচক মনোভাব তুলে ধরে। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এলে আগে থেকে নির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাতে যাননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপির আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল দেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চোরাচালান ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজারের (সিইউএফএল) জেটিঘাটে খালাস করার সময় ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি আটক করে টহল পুলিশ। অস্ত্রের চালানটি উলফার জন্য যাচ্ছিল। এ নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দুটি মামলার রায় দেন আদালত। এর মধ্যে একটিতে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের ফাঁসির আদেশ দেন।

বিএনপি ভারতের সহানুভূতি পেতে আগ্রহী কেন? 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, নির্বাচনে জিততে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক দরকার। এ জন্য সব দল এই দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে, এটা দেখাতে চায়।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ মনে করেন, বিএনপির এই সফর এবং সেখানে গিয়ে আন্তরিক কথা বলায় একটি কথা স্পষ্ট—বিএনপি নির্বাচনে আসছে। তিনি মনে করেন, ভারতের কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক আছে। এখন সেখানে ক্ষমতায় বিজেপি এসেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে যে পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল, সেই স্তরে আছে, এমনটা না-ও হতে পারে। এখন বিএনপি হয়তো বিজেপিকে বোঝাতে চাইবে যে তারা কংগ্রেস-বৈরী ছিল। বিজেপির সঙ্গে তাদের বৈরিতা নেই।

বিএনপি কি আসলেই ভারতবিরোধী অবস্থান পাল্টাচ্ছে, নাকি সামনে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বলছে? কেননা একেবারে সাম্প্রতিক সময়েও তাদের একাধিক নেতা তাঁদের ভারতবিরোধী চিরাচরিত অবস্থানের আদলেই কথা বলেছেন।

গত ২৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকারি অর্থ ব্যয় করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের কাছে আকুতি জানাতে ওই সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। গণমাধ্যমের খবরে এটা পরিষ্কার, প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে ভারতে যাননি, তিনি তিস্তার পানিচুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে যাননি। তিনি ভারতে গেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেনদরবার করার জন্য।’

ভারত সফর শেষ করে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সফর নিয়ে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনার বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, সেটা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। প্রতিদিনের বোমাবাজি, গুলি; আমরা কিন্তু ওদের শান্তি ফেরত দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই আমরা ওগুলোর প্রতিদান চাই না।’

শেখ হাসিনা ‘প্রতিদিনের বোমাবাজি, গুলি’ বলতে মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বন্ধে তাঁর সরকারের সহযোগিতার কথাই উল্লেখ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা থেকে ধরা হয় আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা অনুপ চেটিয়াকে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর উলফা, টিএনভি, এনএলএফটিসহ একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে সহিংসতা অনেকটাই কমে এসেছে।

তবে ভারতকে দেওয়া এসব সহযোগিতা নিয়ে শেখ হাসিনার কথারও সমালোচনা করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পরদিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই যে বলেছেন ভারতকে অনেক দিয়েছেন। আমরা ভালো করে জানি না। আপনি দয়া করে কী কী ভারতকে দিয়েছেন, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করুন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার মনে করেন, এবার বিএনপির কয়েকজন নেতা ভারতে গিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা হয়তো নির্বাচনের আগে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়াস। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে এলে বিএনপি ভারত প্রশ্নে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ নমনীয় হয়। আবার তাদের সারা বছরের কর্মকাণ্ডে ভিন্ন ধরনের চিত্র লক্ষ করেছি।’ এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শান্তনু বলেন, ‘২০১২ সালের শেষ দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। পরে অবশ্য তাঁদের কথাবার্তায় পরিবর্তন দেখেছি।’ তিনি মনে করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে যেকোনো দলের স্থায়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থাকা দরকার।
বিএনপির কয়েক নেতার ভারত সফরে গিয়ে মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি সত্য কথা বলে, এমন প্রমাণ কমই আছে। আমার ধারণা, তাদের নেতারা যে কথা ভারতে বলেছেন, তা তাঁদের দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্তের নয়।’ তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতারা যদি এমন বলেই থাকেন যে তাঁদের অতীত ভারত-নীতি ভুল ছিল, তাহলে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে তারা এত দিন যে নিছক প্রচারণা চালিয়েছেন, তা প্রমাণিত হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খানআওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খানবিএনপির এ সফর দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামে কি না, তা নিয়ে ফারুক খানের সন্দেহ সঠিক বলেই মনে হলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফের কথায়। দলীয় নীতিনির্ধারণী সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির নেতাদের এই সফর না হলেও এটা যে নেহাত কারও ব্যক্তি উদ্যোগের সফর, তা মনে করেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বরং সেখানে গিয়ে বিএনপি নেতারা যে কথাগুলো বলেছেন, তাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তাঁরা। অধ্যাপক ইমতিয়াজ উদ্দিন মনে করেন, দুটি বড় দেশের মধ্যে চীন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের মতৈক্য আছে। এবার ভারত প্রশ্নে তা এলে বরং ভালো।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বিএনপি হয়তো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির চলমান প্রবণতা বুঝতে পেরেছে। তাই ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়াস নিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সব সময় তাদের একই অবস্থান ধরে রাখবে—এটা বাস্তবতাও নয় বলে তিনি মনে করেন। দেশীয় রাজনীতি শুধু নয়, আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তা ইতিবাচক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ভারতবিরোধিতা বিএনপির নির্বাচনী রাজনীতিতে সব সময় মূল বিষয় থেকেছে।’ একটা সমর্থক বা ভোটার শ্রেণি এত দিন ভারতবিরোধী চেতনার ধারক বলে বিএনপিকে বিশ্বাস করত বা সে জন্যই তারা বিএনপিকে ভোট দিত। এখন বিএনপির ভারত প্রশ্নে অবস্থানের পরিবর্তন তাদের কি বিএনপিবিমুখ করবে? অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, ‘বিএনপি তাদের সমর্থকদের পরিবর্তিত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হবে।’

মাদকবিরোধী অভিযানে চলছে পুলিশের ‘তালিকাবাণিজ্য’

অভিযানে গ্রেফতার কয়েকজন

মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ সারাদেশে ‘তালিকাবাণিজ্যে’ নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাহিদা মতো অর্থ না দিলে আটক ব্যক্তিদের নাম মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে পুলিশ।এছাড়া, পুলিশের সোর্স কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যারা পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে তথ্য দিতেন, এমন অনেককে আটকের পর মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। আবার প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

রাজধানীর রামপুরার বাগিচারটেক এলাকার বাসিন্দা শাহীন আহমেদ (৪০)। এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে নষ্ট হয়ে যাওয়া এয়ারকন্ডিশনার (এসি) মেরামতের কাজ করেন তিনি। সেই সুবাদে অনেকের সঙ্গেই পরিচয় রয়েছে তার। এলাকায় নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন শাহীন। মাদক ব্যবসায়ী ও এর সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করতেন। কয়েক মাস আগে রামপুরা থানার সিদ্দিক নামে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। গত বুধবার (৬ জুন) দিবাগত রাতে শাহীনকে একটি মোটরসাইকেলসহ আটক করে পুলিশ। পরে দেখানো হয়, তার কাছে ১৩৫ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রামপুরা থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় শাহিনকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে রিমান্ডের আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

শাহীন আহমেদের ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস লিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুলিশ সদস্যদের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় তার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে। তিনি এলাকায় বাসাবাড়িতে এসি মেরামতের কাজ করতেন। এলাকায় কোনও অন্যায়-অনিয়ম দেখলে তিনি প্রতিবাদ করতেন। সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেটা জানিয়ে দিতেন। সেই সুবাদে তার সঙ্গে অনেকের পরিচয় ছিল।’ লিনা বলেন, ‘বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে একটি ফোন পেয়ে তিনি ঘর থেকে বের হন। এরপর শুনি তাকে ইয়াবাসহ পুলিশ আটক করেছে। থানায় নিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। অতীতে তার বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা বা অভিযোগ ছিল না।’ মাদক ও পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই তার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

শাহীনের বোনের এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামপুরা থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাই এমন প্রশ্ন করলে কষ্ট পাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ। যে অভিযোগ করেছে তাকে নিয়ে আইসেন। বাগিচারটেকের শাহীনকে ১৪-১৫ জন লোকের সামনে থেকে আমরা ১৩৫ পিস ইয়াবাসহ ধরেছি। বহুদিন বেটাকে ধরতে পারিনি। এবার পেরেছি। সে অরিজিনালি ইয়াবা ব্যবসায়ী।’

রাজধানীর দোয়েল চত্বর ও হাইকোর্ট মাজারের মাঝামাঝি স্থানে পুলিশের তল্লাশিতে পড়েন নিউমার্কেটের এক ব্যবসায়ী। হয়রানির ভয়ে পত্রিকায় নিউজ হোক এটাও চান না তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৮ মে ভোরে আমি নিউমার্কেট থেকে কাপ্তানবাজারে যাচ্ছিলাম। হাইকোর্ট মাজারের একটু আগে আমার মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি করে তারা।’ একপর্যায়ে পুলিশ বলে, ‘এই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গাড়িতে ওঠা।’ তখন আমি বলি, ‘‘স্যার, আমি নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী, বিশ্বাস না হইলে আমারে নিয়ে নিউমার্কেটে চলেন। আমার এই কথা শুনে পুলিশ বলে, ‘আমরা কি তোর বাপ-দাদার চাকর?’ ওদের বিশ্বাস করার জন্য আমার পরিচিত একজনকে ফোন করে জানালাম। সে আসার পর পুলিশ তাকেও ধরে। তার উদ্দেশে পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘এই, এটা ইয়াবার ডিলার, এরেও গাড়িতে ওঠা।’

নিউমার্কেটের এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আমার কাছে ছিল ২০ হাজার টাকা, আর আমার পরিচিতজনের কাছে ছিল ৬ হাজার টাকা। মোট ২৬ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমরা ছাড়া পাই।’ তবে কোন থানার পুলিশ সদস্যরা তখন সেখানে দায়িত্বে, তা জানাতে পারেননি ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের এ কথা জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি। আগে ফাঁকা রাস্তায় ছিনতাইকারীর ভয় পাইতাম। এখন ফাঁকা রাস্তায় পুলিশ দেখলে ভয় পাই।’

.

মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার ব্যক্তিরাপিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় নুসরাত শাহী ওরফে কিংজল নামে এক চিহ্নিত মাদকসেবী ও একাধিক মামলার এজাহারভুক্ত আসামিকে ধরার ৩৬ ঘণ্টা পর আর্থিক সুবিধা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে মঠবাড়িয়া থানার ওসি মো. গোলাম ছরোয়ারের বিরুদ্ধে। গত ২৭ মে রাত ১০টার দিকে উপজেলা শহর থেকে কিংজলকে ধরে এনে মঠবাড়িয়া থানায় রাখা হয়। পরে আদালতে হাজির না করে গত ২৯ মে সকাল ১০টায় কিংজলকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি গোলাম ছরোয়ার।রৌমারীর শৈলমারীতে চরের গ্রামের মো. আবু বক্করের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম হায়দারকে মাদকের মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে কয়েক দফায় টাকা নিয়েছেন রৌমারী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম। এ বিষয়ে ওসির বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ করেছেন হায়দার। এই ওসির বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা পরিচালনা, মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ লিখিত আকারে গত ১৫ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বরাবর পাঠিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

ফেনীর ফুলগাজীতে পুলিশকে টাকা না দেওয়ায় শামীম (২৫) ও মজনু মিয়া মনিরকে (২৩) ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শামীমের মা আনোয়ারা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৪ মে বুধবার দুপুর ২টার দিকে ফুলগাজী থানার এসআই শফিক এসে শামীমকে তুলে নিয়ে যান। সে সময় বাড়ির পাশে জমিতে গরুর জন্য ঘাস কাটছিল শামীম। একই সময়ে রতন নামে আরেক যুবককেও ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে পুলিশ আমাদের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। রতনকে ছেড়ে দিলেও টাকা দিতে না পারায় ওইদিন রাতে আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ।’

নিহত মজনু মিয়া মনিরের বোন রোজিনা বেগম বলেন, ‘বুধবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ফেনী শহরের বড় মসজিদ এলাকার বোনের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মনিরকে। পরে তাকে ছাড়িয়ে আনতে ডিবি অফিসে গেলে পুলিশ দেড় লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় ভোররাতে পুলিশ মনিরকে গুলি করে হত্যা করে।’ তবে স্বজনদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ফুলগাজী থানার ওসি হুমায়ুন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিহত দুই যুবক এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। মাদকের টাকায় তারা তাদের পরিবার চালাতো। তাই স্বজনরা এসব মনগড়া অভিযোগ করেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তাদের তুলে নেওয়া এবং তাদের পরিবারের কাছে টাকা দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

পুলিশ সদস্যদের মাদক ব্যবসা, নিরীহদের ধরে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে ‘তালিকাবাণিজ্যের’ অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সহেলী ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ আমরা পাচ্ছি— লিখিত কিংবা মেইলে। সব অভিযোগেরই তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগের প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’

গায়ক আসিফ কারামুক্ত

গায়ক আসিফ আকবর কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জুন) বিকাল ৪টায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান।

এর আগে সোমবার (১১ জুন) তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরকে জামিনে মুক্তির আদেশ দেন ঢাকা মহানগর আদালতের বিচারক কেশব রায় চৌধুরী।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (৫ জুন) দিবাগত রাত দেড়টায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি টিম কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরকে এফডিসি সংলগ্ন তার স্টুডিও থেকে গ্রেফতার করে। সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী শফিক তুহিনের দায়ের করা তেজগাঁও থানার একটি মামলায় (নম্বর ১৪) তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১ জুন আনুমানিক রাত ৯টার দিকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ২৪-এর সার্চলাইট নামের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর অনুমতি ছাড়াই তার সংগীতকর্মসহ অন্য গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীদের ৬১৭টি গান বিক্রি করেছেন। পরে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, আসিফ আকবর আর্ব এন্টারটেইনমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে অন মোবাইল (প্রা.) লি. কনটেন্ট প্রোভাইডার, নেক্সনেট লি., গাক মিডিয়া বাংলাদেশ লি. ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গানগুলো ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে ট্রু-টিউন, ওয়াপ-২, রিংটোন, পিআরবিটি, ফুলট্রেক, ওয়ালপেপার, অ্যানিমেশন, থ্রি-জি কন্টেন্ট ইত্যাদি হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যবহার করে অসাধুভাবে ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।

এজাহারে শফিক তুহিন আরও বলেন, ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গত ২ জুন রাত ২টা ২২ মিনিটে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে অনুমোদন ছাড়া গান বিক্রির ওই ঘটনা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন। তার ওই পোস্টের নিচে আসিফ আকবর নিজের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে অশালীন মন্তব্য ও হুমকি দেন। পরের দিন রাত ৯টা ৫৯ মিনিটে আসিফ আকবর তার প্রায় ৩২ লাখ লাইক সমৃদ্ধ ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে আসেন।

মোট ৫৪ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড লাইভ ভিডিওর ২২ মিনিট থেকে তার (শফিক তুহিন) বিরুদ্ধে অবমাননাকর, অশালীন ও মিথ্যা-বানোয়াট বক্তব্য দেন। ভিডিওতে আসিফ আকবর তাকে (শফিক তুহিন) শায়েস্তা করবেন এ কথা বলার পাশাপাশি ভক্তদের উদ্দেশে বলেন, তাকে যেখানেই পাবেন সেখানেই প্রতিহত করবেন। এই নির্দেশনা পেয়ে আসিফ আকবরের ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে হত্যার হুমকি দেয়। আসিফ আকবরের এই বক্তব্য লাখ লাখ মানুষ দেখেছেন। তিনি উসকানি দিয়েছেন। এতে তার (শফিক তুহিন) মানহানি হয়েছে

ভারতের প্রতি কেবলই কৃতজ্ঞতার সুর হাসিনার গলায়, কৌশলে এড়ালেন তিস্তা প্রসঙ্গ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শান্তিনিকেতনে বহু প্রতিক্ষীত বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন করলেন নরেন্দ্র মোদী ও শেখ হাসিনা। শুক্রবার (২৫ মে) উদ্বোধন অনুষ্ঠানের বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

এদিন হাসিনার বক্তব্যজুড়ে ছিল দু’দেশের যৌথ ঐতিহ্য ও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নানা অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা। মুজিবকন্যা এদিন বলেন, ২০১০ সালে ভারত সফরে এসে শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ ব্যাপারে কথা বলেছিলেন তিনি। ভবন নির্মাণের ব্লু প্রিন্ট তৈরি হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। প্রায় ৮ বছরের মাথায় আজ বাস্তবায়িত হল দুই বাংলার স্বপ্ন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন হল গুরুদেবের আশ্রমে।

অনুষ্ঠানের সূচনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রত্যেকটি কথায় উঠে এসেছে ভারতের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসার কথা।

ছিটমহল বিনিময়, সীমান্ত চুক্তির প্রসঙ্গ উত্থাপন করে হাসিনা বলেন, ‘‘মুজিব-ইন্দিরার চুক্তির পর বাংলাদেশে আগেই স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে আইন পাশ হয়ে গেলেও ভারতে সেটা হয়নি। ভারতে দীর্ঘদিন পরে ভারতের সংসদে ‘৭১ সালের মতো দলমত নির্বিশেষে সকলে মিলে সব সংসদ সদস্য মিলে এক হয়ে বিলটি পাশ করে দিল। স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হল।’’

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছিটমহল নিয়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেখানে ভারত ও বাংলাদেশ যেভাবে ছিটমহল বিনিময় করেছে, তার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান হাসিনা।   হাসিনা বলেন, ‘‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী, আমাদের বড় বন্ধু। ভারতের অবদান আমরা ভুলব না। যে কোনও সমস্যা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে সমাধান করতে পারব। আমাদের উন্নয়নে ভারত সহযোগিতা করে যাচ্ছে।’’

বক্তব্য রাখার মাঝেই ১৯৭৫ সালের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। কীভাবে সেসময় তাঁদের পরিবারের ওপর হামলা চলেছিল, কীভাবে তাঁর আত্মীয়রা প্রাণ হাতে নিয়ে ভারতে এসেছিলেন, সেসময় কীভাবে ভারত পাশে দাঁড়িয়েছিল, তারই স্মৃতিচারণা করেন তিনি। হাসিনা বলেন, ‘সেইসময় ভারত যদি আমাদের পাশে না দাঁড়াত, তবে জানি না আমাদের কী হত। সেসময় ভারতের স্নেহছায়া যদি না পেতাম, যদি আমাদের জীবন অন্যদিকে মোড় নিত।’

এদিন রোহিঙ্গা প্রসঙ্গও উঠে আসে হাসিনার কথায়। তিনি বলেন, ‘প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আমরা আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। আমরা তাদের তাড়াতে পারিনি। এক্ষেত্রেও আমরা ভারতকে পাশে পেয়েছি।’

বাংলাদেশ ভবনে যে দুই দেশের ভাষা, বাংলা ভাষার চর্চা হবে, তা নিয়ে গবেষণা হবে, এদিনের বক্তৃতায় সেকথাই বারবার বলেছেন শেখ হাসিনা। ‘ভারত বাংলাদেশ বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক-এ কথায় বলে নিজের বক্তব্য শেষ করেন হাসিনা।

এদিনের অনুষ্ঠানে কথার বলার মাঝে, একবার তিস্তা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেননি শেখ হাসিনা। তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি এখনও রূপায়িত হয়নি। এই নিয়ে কি অনুষ্ঠানের বাইরে মোদী-হাসিনা আলোচনা হবে না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে।

এরপরই বক্তৃতা রাখেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন তিনিও। সব পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশের পাশে থাকার আরও একবার আশ্বাস দেন মোদী।

/সাউথ এশিয়ান মনিটর

‘ব্যাংক ডাকাতদের’ শাস্তি চায় এফবিসিসিআই

  • একশ্রেণির লোক ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছেন
  • স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে
  • জনগণের আমানত যেন তছরুপ না হয়, সুদের হার না বাড়ে
  • দোষীদের বিচারের আওতায় আনার প্রস্তাব

ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হওয়াকে ব্যাংক ডাকাতি বলে অভিহিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘একশ্রেণির লোক আছেন, যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছেন, ব্যাংকের টাকা ডাকাতি করেছেন। আমরা তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যাঁরা ব্যবসা করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সহায়ক ভূমিকা দেখতে চাই।’

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের পর্যালোচনা তুলে ধরতে গিয়ে সংগঠনটির সভাপতি এসব কথা বলেন। গতকাল শনিবার মতিঝিলের ফেডারেশন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের বাজেট পর্যালোচনা তুলে ধরে এফবিসিসিআই।

অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সংগঠনটির পক্ষে ব্যাংকে অনিয়মের জন্য তদন্তের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ব্যাংকিং খাতে একধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, যা আমাদের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার প্রস্তাব করছি, যাতে করে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বজায় থাকে।’

প্রশ্নোত্তর পর্বেও ব্যাংক নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর দেন শফিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক ডুবতে বসেছে। এর জন্য দায়ীদের অনেকেই এখন বিচারাধীন আছেন। বিচারাধীন বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংক একীভূত, অধিগ্রহণ—কী করলে ভালো হবে, এগুলোর সব তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে আছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে এগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, সেটি আমাদের দাবি।’

ব্যাংকিং কমিশন গঠন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর পিছু হটার বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি বলেন, ‘সেটা অর্থমন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। তবে দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি ছিল, তা থেকে অনেক উন্নতি হয়েছে। আমরা চাই এ ক্ষেত্রে আরও উন্নতি হোক। অনেক সাবেক মন্ত্রী, অনেক সাংসদকেও কিন্তু আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এটি আশাব্যঞ্জক। আমরা চাইব তাঁদের কারণে জনগণের আমানত যেন তছরুপ না হয়, যেন সুদের হার না বাড়ে, যেন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নেবে।’

সার্বিক বাজেট নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের মূল্যায়ন হলো, এই বাজেটে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ইত্যাদি খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় সুবিধাভোগীদের সংখ্যা এবং মাসিক ভাতার হার বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থাসহ অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা নিঃসন্দেহে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান-প্রক্রিয়া গতিশীল করবে বলে উল্লেখ করেছে এফবিসিসিআই।

অবশ্য বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে বলে মনে করে এফবিসিসিআই। একই সঙ্গে তারা বাজেট বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহির মধ্যে আনার তাগিদ দিয়েছে।

বাজেট ব্যবসাবান্ধব কি না—জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি বলেন, ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়বে। তবে সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় নিলে বাজেটে বিশেষ কোনো হেরফের হবে না। বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা বেসরকারি খাত অর্জন করতে পারবে কি না—জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি বলেন, বিনিয়োগের সক্ষমতা বেসরকারি খাতের আছে। এর জন্য পরিবেশ তৈরি করা দরকার। পুঁজিবাজারে অনুকূল পরিবেশ না থাকলে, সুদের হার বেশি হলে তাহলে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন না।

অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সক্ষমতা বাড়ানো, উৎপাদনশীল খাতে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো, পোশাক খাতের করপোরেট কর আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া, করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ টাকা করা, হয়রানি রোধে কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতা কমানোসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। তাঁরা স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া ও কিছু শিল্প খাতে উপকরণের কর কমানোয় সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ঢাকা মহানগরে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হওয়ার আগে অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনের রাইড শেয়ারিং সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপ না করার সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান যানজটে দ্রুত যাতায়াতের জন্য এ ধরনের সেবার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

 এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, সহসভাপতি মো. মুনতাকিম আশরাফ এবং সংগঠনের পরিচালকেরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

তারা কি ফিরবে আর সুপ্রভাতে

তাঁরা আর সুপ্রভাতে ফিরবেন কিনা আমাদের জানা নেই। তাঁদের কে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে দেশের আইন শৃংখলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে। এটি হতে পারে এন এস আই, এটি হতে পারে ডি জি এফ আই, এটি হতে পারে র‍্যাব, হতে পারে ডিবি, হতে পারে সরকারী অন্য কোনো “গেস্টাপো” বাহিনী। আমরা জানিনা। আমাদের জানবার রাস্তাও নেই।

তবে আমরা এইটুকু বুঝি যে দেশে এক নতুন আলবদর নেমেছে। ১৯৭১ সালে যেমন আলবদর, আল-শামস, রাজাকার রা উঠিয়ে নিয়ে যেতো আমাদের বুদ্ধিজীবিদের, রাজনীতিবিদ্দের, ঠিক তেমন। আমরা আইনের শাষনের কথা বলি কিন্তু এই খোদ আইন শৃংখলা বাহিনীর এরা আইনের ধার ধারে না। আপনাকে যে কোন সময় উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারে ঘর থেকে, রাস্তা থেকে। আপনি কিংবা আপনার পরিবার কেউ কোনদিন জানতে পারবেন না আপনাদের অপরাধের কথা কিংবা কেন আপনাকে এইভাবে চোখ বেঁধে খুনী গুন্ডারা উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

যদি কারো বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থেকে থাকে তাহলে দেশে কি আইন নেই? তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যেতে পারত, আদালতে সুরাহা করা যেতে পারত। কিন্তু সেগুলো করা হয়নি। কারন এই আলবদর বাহিনীর সেই ক্ষমতা নেই। তাঁদের আছে উঠিয়ে নেবার ক্ষমতা। আমাদের টাকায় এদের অস্ত্র কিনে দেয়া হয়েছে আর সেই টাকা দিয়ে আমাদেরকে ওরা ভয় দেখায়। আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আমাদেরকে নির্যাতন করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের তো কথা ছিলোনা নতুন করে আলবদর দেখবার কিংবা আল শামস দেখবার!! কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ঠিক ৪৬ বছর পর আমরা চক্রাকারে সেই আগের সময়েই ফিরে গেলাম। আমাদের সন্তান এখন রাস্তায় নিরাপদ না, আমাদের বাবারা রাস্তায় নিরাপদ না, আমাদের চাচারা রাস্তায় নিরাপদ না, আমাদের মায়েরা, আমাদের বোনেরা, আমাদের বন্ধুরা কেউ নিরাপদ না।

আমরা এক ভয়ানক সময়ে বেঁচে আছি। আমরা বেঁচে আছি এক দুঃসহ যন্ত্রণার মুহুর্তে। আমাদেরকে পদ্মা সেতুর উন্নয়নের গল্প বলা হয়, আমাদেরকে মেট্রো রেলের গল্প বলা হয়। আমাদেরকে চার লেইনের রাস্তার গল্প বলা হয়, নতুন নতুন এয়ারপোর্ট, কালভার্টের গল্প বলা হয়, আমাদের জন্য আমদানী করা হয় ইসলামী ব্যাংকের নির্বোধ সোফিয়াকে। আমাদের চোখের সামনে বড় বড় লারেলাপ্পা খেলার আয়োজন হয় আর সেই আয়োজনের পেছন দিয়ে আমাদের ভাইদের, বাবাদের, চাচাদের খুন করা হয়, গুম করা হয়।

আমরা কি তবে এই বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে, এই ভূখন্ডে জন্ম নিয়ে পাপ করে ফেলেছি?

শামীম ওসমানকে বর্জন করতে পারবেন কি এই নির্বাচনে?

সমস্ত পৃথিবীর মানুষ একমত এরকম বিষয় অনেক কম। এর মধ্যে একটি হচ্ছে শিশুদের নিরাপত্তা। আপনি যতই খারাপ হোন না কেন, যতই অমানবিক জীবনযাপন করেন না কেন আশা করা হয় শিশুদের প্রতি মানবিক থাকবেন। বিশ্বব্যাপী জাহাজডুবি বা এরকম দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও সবার আগে শিশুদের উদ্ধার বা তাদের জীবনকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেয়ার নিয়মও আছে। এমনকী যেসব মানবগোষ্ঠী সভ্যতার আশীর্বাদ বা অভিশাপ থেকে দূরে, জঙ্গলে বসবাস করে তারাও শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এখন একটি আজব দেশের কথা বলব যা এখানে ব্যতিক্রম।

নারায়ণগঞ্জের রাফিউর রাব্বিকে অনেকেই চেনেন। তাঁর মাত্র ১৭ বছরের ছেলে ত্বকীকে নির্মমভাবে হত্যা করে শামীম ওসমানের লোকেরা। এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি বর্বর শামীম ওসমানকে দায়ী করে বারবার বিচার চেয়েছেন রাফিউর রাব্বি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় নি, শামীম ওসমানকে গ্রেফতারও করা হয়নি। বরং এ ঘটনার পর সবাই যখন ধিক্কার দিচ্ছে তখন সংসদে দাঁড়িয়ে ওসমান পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। এছাড়া তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে। (লিংক কমেন্টে)

অথচ এই শেখ হাসিনার একটি ভাই শিশু শেখ রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর পরিবারের এতগুলো সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হল। আমরা আশা করতে পারতাম যেকোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতি তিনি স্পর্শকাতর থাকবেন। কিন্তু কোথায় কী!

আওয়ামী লীগের কর্মীরা স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তুলেন। শিশুহত্যাকে যেখানে সমর্থন দেয়া হয় সেখানে কোন ধরণের স্বাধীনতা বিদ্যমান থাকে?

শামীম ওসমানকে বর্জন করতে পারবেন কি এই নির্বাচনে?

প্রাতিষ্ঠানিক খুনী র‍্যাব

র‌্যাব এখন খুনি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুন-গুমে জড়িয়ে পড়েছে। টাকার বিনিময়ে র‌্যাব গুম-খুনের কাজ করছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন।নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের সাথে জড়িত র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে বিএনপির এমন আশঙ্কাই প্রমাণিত হয়েছে।আজ বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১১টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের সাথে মতবিনিময় শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

ফখরুল বলেন, র‌্যাবের এরূপ কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বেশ কিছুদিন যাবৎ র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি করে আসছেন। র‌্যাবর প্রয়োজন নেই বলেও দাবি করছেন বেগম জিয়া। র‌্যাব বিলুপ্ত করে একটি ইফেকটিভ প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্যও তিনি সরকারের প্রতি দাবি করেন।

তার দাবি যে যৌক্তিক আজ তা প্রমাণিত হয়েছে।ঢাকা থেকে জিয়াউর রহমানের মাজার স্থানান্তর প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, যেহেতু এ বিষয়টি নিয়ে আমরা অফিসিয়ালভাবে কোনো তথ্য পাইনি, তাই এ ব্যাপারে মন্তব্য করাটা আমি সমীচীন মনে করি না। এ সময় তার সাথে ছিলেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক গৌতম চক্রবর্তী, রমেশ দত্ত, দীপেন দেওয়ান, দেবাশীষ রায়, সুশীল বড়ুয়া প্রমুখ।

খুনী র‍্যাব আর সহযোগী আওয়ামীলীগ

লন্ডন সময় বেলা ১১টা। অফিসে কাজের ফাঁকে অনলাইন পত্রিকায় প্রিয় মাতৃভূমির আপডেট খবর পড়ছিলাম। শীর্ষনিউজ অনলাইনটি খুলতেই নজরে এলো প্রথম চারটি সংবাদই ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সংক্রান্ত। এর তিনটিই হলো পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত। নিহত ১, আহত অনেক। গোলাগুলি, বাড়িতে হামলা, হাসপাতালে ভর্তির তথ্য জানা গেল। ঘটনা তিনটি কুমিল্লা, সোনারগাঁও এবং শরীয়তপুরে।

নিজ দলের সহকর্মীদের গুলিতে নারায়নগঞ্জে জীবন হারালো যুবলীগ কর্মী জামাল। একজন নিপিড়িত সাংবাদিক হিসেবে মরহুম জামালের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে জামালের হাতে এর আগে কারো জীবন সংহার হয়েছে কি-না, আমার জানা নেই; তবে জীবনের বিদায়বেলা তিনি নিপিড়নের শিকার হয়েছেন, এমনকি তার সবচেয়ে মূল্যবান জীবনটিও কেড়ে নেয়া হলো। ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি শহীন কি-না, সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারছি না। কেননা জামালের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই, তার পূর্ব কর্মকান্ড সম্পর্কেও আমি তেমন জানি না। কোনো ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি রাজনীতি করে থাকলে, এই সংঘর্ষে অংশ নেয়ার পেছনে ভাল কোনো উদ্দেশ্য থাকলে তিনি শাহাদতের মর্যাদা পেতেও পারেন। যেহেতু এসব সম্পর্কে আমার জানা নেই, সেহেতু একজন মানবের হত্যার শিকার হওয়া, এই যুবকের জীবন কেড়ে নিয়ে একটি পরিবারকে শোকে ভাসানো কিংবা একজন মায়ের বুক খালি করার জন্য যারা দায়ী, তাদের পাপের শাস্তি চাওয়ায় আমার কোনো দোষ হবে বলে আমি মনে করি না।

সবকিছু মিলিয়ে যুবলীগ কর্মী জামাল মৃত্যুকালে আওয়ামী জাহিলিয়াতের অস্ত্র-সন্ত্রাসের শিকার হলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীরা যেমনটি হয়েছেন, হচ্ছেন। বিশেষ করে গত সাত বছরে সহস্রাধিক ব্যক্তি আওয়ামী অস্ত্রধারী ক্যাডার এবং সরকারি বাহিনীতে যোগ দেয়া ক্যাডারদের গুলিতে জীবন দিয়েছেন। আমি জামালের মা/স্ত্রীর আকুতির প্রতি সহমর্মিতা জানাই।

আওয়ামী খুনী ক্যাডারদের মায়েদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, আপনারা কান পেতে শুনুন আমার ভাই সুমনের মা, স্ত্রী ও সন্তানের আর্তনাত। ক’দিন আগেও জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে মিডিয়ার সামনে এসে বিলাপ করে গেছেন সম্প্রতি গুম-খুনের শিকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মা, স্ত্রী ও শিশু সন্তানেরা। মাসুম বাচ্চার আর্তনাত সহ্য করা যায় না। সেদিন গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা মো. জহিরের মা হোসনে আরা বেগম বলেন, আমার সন্তানের খোঁজ এখনও পাইনি। তার বাবা মৃতপ্রায়। আমরা ছেলের সন্ধান চাই। এমনিতেই সন্তানের খোঁজ পাইনি তার ওপর প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ বাসায় গিয়ে টাকা চায়। আমরা আর কান্না করতে পারব না। সরকারকে বলব আমাদের সন্তানদের ফেরত দিন। রাজধানীর ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি খালিদ হাসান সোহেলের স্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি কবে সোহেল ফিরে আসবে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার স্বামীকে ফেরত দিন। গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা পারভেজের চার বছরের শিশুকন্যা হৃদি বলে, শেখ হাসিনা আন্টি, আপনি আমার পাপাকে ছেড়ে দিন। আমরা আপনার জন্য দোয়া করব।
প্লিজ পাপাকে ছেড়ে দিন। আমি স্কুলে যাব, চকলেট খাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা চঞ্চলের পাঁচ বছরের ছেলে আহাদ আলী বলে, শেখ হাসিনা আন্টি, আপনি আমার পাপাকে ছেড়ে দিন। পাপাকে ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না। মা-দাদা পাপার জন্য সব সময় কাঁদে। তেজগাঁওয়ের গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আমার ভাই নিখোঁজ হয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের দিকে ফিরে তাকান। গুম হওয়া পরিবারগুলোর সদস্যরা বাঁচতে চায়।

এরকম হাজার হাজার পরিবারে এখন কান্নার রোল চলছে। এ কান্না বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। যারা গুম-খুনে জড়িত, তাদের মা, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি আমার আবেদন- আপনারা রুখে দাড়ান। পুলিশ, র্যাব, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী আপনাদেরও জীবন আছে। আপনি যদি গুম হয়ে যান, যুবলীগ কর্মী জামালের মতো নিহত হন, এই খুন-খারাবি করে আপনার কি লাভ?

গুম-খুনে অংশ নেয়া পুলিশ, র্যাব, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের মা-স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি আবেদন জানােবা, আপনারা ওদের সামলান। যারা এসব বাহিনী ও সংগঠনে জড়িত, তাদের লাগাম টেনে ধরুন। নইলে একে একে ওরা পারস্পরিক নিজেদেরকেই হত্যা করবে। যা আপনারা নারায়ানগঞ্জে সাত মার্ডারে দেখেছেন। দেশজুড়ে দেখছেন। এরপর বাতাস ঘুরে গেলে আরো ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হলে আপনাদের চোখের পানি কে মুছবে? এসব ভাবুন। প্রিয় মা, আপনার লাগামহীন সন্তানকে; প্রিয় বোন, আপনার খুনী স্বামীকে; প্রিয় সোনামনি, তোমার সন্ত্রাসী বাবাকে ভাল পথে থাকতে বলো। ভাল পথে ফিরতে বলো। শান্তির পথ পরিবারকেও শান্তি দেবে। অনেক ক্ষমতা ও টাকা-পয়সা তোমাদের সুন্দর বাড়ি, গাড়ি, বাসা, পোশাক ও খাবার দেবে, কিন্তু পরিবারে শান্তি দেবে না। যা তোমরা এখন প্রতিদিনই উপভোগ করছো। অশান্তির নিড় হয়ে উঠছে প্রতিটি খুনী র্যাব-পুলিশ সদস্যের পরিবার। যুবলীগ-ছাত্রলীগের মধ্যে গুম-খুনে অংশ নেয়া কর্মীদের পরিবার।

শুধু ক্ষমতা ও অবৈধ পথে উপার্জন আর ভোগে শান্তি নেই; প্রকৃত শান্তির পথ খুঁজুন। সবাই মিলে একটি শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নিন। যাদেরকে হত্যা করেছেন, তাদের কাছে ক্ষমা চান। এই জনপদে রক্ত ঝরানো বন্ধ করতে হবে। রক্তাক্ত জনপদ হয়ে উঠুক পারস্পরিক ভালবাসায় সিক্ত ফুলের বাগান। শান্তির নিড় হয়ে উঠুক প্রতিটি পরিবার। হিংসা-প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ কারো জন্যই শুভ নয়। আপনাদের সকলের প্রতিটি মুহূর্ত শুভ হোক, এই প্রত্যাশায়।